চর আণ্ডা

আইজ নদীতে খুব রাগ – দুই ধারে নদীর কূল দৃষ্টিতে যখন সরু হতে হতে প্রায় বিলীন তখন মাঝির এমন কথায় ভয়ই লাগে । এমনিতেই ছোট নৌকা তার উপরে ১২/১৩ জন লোক মোটামুটি এঁটেই বসে আছি ।বেশ জোরে সোরেই ঢেওএর বারি একের পর এক লাগছে নৌকায় । অভিযাত্রীদের এসবের মাঝে কোন খেয়াল নেই সবাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে কোন এক দূর অজানায়। যেখানে কেবলই মুক্ত বাতাস খেলা করছে ।

সকালবেলা চর পাতিলা থেকে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই ডান পার্শের চর কুকরি-মুকরির সৌন্দর্য যেন গ্রাস করছিলো সবাইকে । বিশাল বিশাল মহিষের পাল রাখাল ছারাই চরে বেড়াচ্ছে , তারি পাশে এক খোলা যায়গায় যেখানে হয়ত কোন এক সময় মাছের শুঁটকি করেছিলো জেলে সেখানে খেলে বেড়াচ্ছে সাদা বকের ঝাঁক । দূরে মাছ ধরা ট্রলার থেকে পেতে রাখা জালের চিহ্ন উঁকি দিচ্ছে নদীতে । বাম পার্শে একসময় ঢালচর চোখে পড়েছিলো । আমাদের নৌকা সেটাকে দৃষ্টি সীমানার পেছনে ফেলে ছুটে চলছে সোনার চরের দিকে ।

আমারা সোনার চরের কাছাকাছি চলে এসে দেখতেপাই এদিকটায় যেখানে সেখানে নামার আসলে উপায় নাই ।ভাটার টানে পানি নেমে গেলে কাদায় ভরে যায় কূল । চরে আমাদের যখন নামিয়ে দেয় মাঝি তখন বেলা প্রায় ১১.৩০ । মূলত নৌকা সোনার চরের খাল ধরে বিট অফিস পর্যন্ত নিয়ে যাবার কথা ছিলো । কিন্তু ঐ ভাটার কাড়নেই দুপুর দুইটার আগে আর খালে নৌকা নিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব না । উপায় না দেখে আমরা সবাই তীরেই নেমে পরলাম । ভেজা নরম মাটিতে পা পরতেই মনে আনন্দ চলে আসল। কাদায় খালি পায়ে ঠাণ্ডা মাটির স্পর্শ , আহা ।ঠাণ্ডা শীতল মাটিতে পা ফেলে চললাম দুরের ঝাঁও বনের পানে ।নৌকা আসতে ঢেঁড় দেরি তখন । এরই মাঝে আমারা সিদ্ধান্ত নেই ঝাওবন ঘুরে দেখব। আমারা যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় বারটার উপরে ।রোদ মাথার উপরে থাকলেও ঝাওবনে বইছে শীতল বাতাস । কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে আমার । দেরি না করে হ্যামক ঝুলিয়ে লেটিয়ে পরলাম । ঘুম ভেঙ্গে যখন চোখ মেলেছি তখন দেখলাম শুধু আমি না আমার সফর সঙ্গী আরও দুইজন আমার পাশেই হ্যামক ঝুলিয়ে আয়েশে ঘুমাচ্ছে । অবাক হলাম পাশে শেয়ালের ঘুরাঘুরি দেখে । বিশাল সাইজ । দিনের বেলাতেও নির্ভয়ে আমাদের কাছ দিয়েই চলাচল করছে। কথায় আছে যে বনে বাঘ নাই সে বনে শেয়ালই বাঘ । তাদের চালচলন ও এইরকম । চোখে তখনো আমার রাজ্যের ঘুম আবার তলিয়ে গেলাম ঘুমে।

সোনার চরে কোন একসময় হ্যালি প্যাড করা হয়ে ছিল যার এখন অবশিষ্ট বলতে সিমেন্টের কিছু চাই পরে আছে । সরু একটা হাটার রাস্তাও করা হয়ে ছিলো খালের জেটি থেকে টুরিস্ট দের থাকবার জন্য নির্মিত বাংলো পর্যন্ত ।খুঁজতে খুঁজতে একটা টয়লেট ও দেখতে পেলাম ।এমন জনমানব হীন দ্বীপে ইংলিশ কমোড অনেকটাই বেমানান । তার উপর কোন একজন অতি উৎসাহী ব্যক্তি ইটের সাহায্যে এক সাইড ভেঙ্গেও রেখেছে সর্বোপরি ইহা আর ব্যাবহারের উপযুক্ত না । সো যেই লাও সেই কদু ।পূর্বের চর গুলোর ন্যায় এখানেও নিজ নিজ দায়িত্বে ঝোপ ঝাঁরে আমাদের কাজ সারতে হলো ।

সোনারচর ৩০ এর দশকে জেগে ওঠা অপার সম্ভাবনা সৌন্দর্যের দ্বীপটির সোনালি বালুকাবেলা সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে দূর থেকে সোনার ন্যায় রঙ ধারণ করে যার থেকে লোকমুখে এই চরের নাম হয়ে যায় সোনারচর। সোনার চরে রয়েছে বিশ হাজার ছাব্বিশ হেক্টর বিস্তৃত বনভূমি। রয়েছে সুন্দরী, কেওড়া, গড়াল, গর্জন, খইয়া বাবলা ও ছৈলা সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বঙ্গোপসাগরের কোল জুড়ে বেড়ে ওঠা সোনার চরের আয়তন প্রায় ১০ হাজার একর। উত্তর-দক্ষিণ লম্বা-লম্বি এ দ্বীপটি দুর থেকে দেখতে ডিমের মত। ২০০৪ সালে এটা প্রথম আলোচনায় আসে। এরপর পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ বনায়ন করে এ চরে। বনে ছাড়া হয় তিনশ’টি হরিণসহ, বানর, বন্য মহিষ, শুকর ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। রয়েছে নানা প্রজাতির পাখ-পাখিও। পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ থেকে জানা যায়, ২০১১সালের ১৬ ডিসেম্বর সংরক্ষিত এ বনভূমি বন্যপ্রাণীদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার।

নিরিবিলি বালু ময় বিশাল বীচ এবং পাশে বন থাকায় ক্যাম্পিং করার জন্য আদর্শ যায়গায়ই বলা যায় । যদিও সিক্যুরিটি ইস্যুর জন্য আমাদেরকে মাঝি সোনার চরের বিট অফিসের পাশে ক্যাম্প করার পরামর্শ দেন ।সোনার চর ভেদ করে বেশ কিছু খাল চলে গিয়েছে দেখতে অনেকটাই সুন্দরবনের খাল গুলির মত এবং কোন কোন টা আসলে অতুলনীয় ।আর এই খাল পরিভ্রমণ কালে আপনার চোখে পড়বে অতিথি পাখির ঝাঁক সহ নানা প্রজাতির পাখী এবং বন থেকে বেরিয়ে আসা শেয়ালের মাথা । প্রচুর শেয়াল রয়েছে এই দ্বীপ গুলিতে।

দুপুরে জেলেদের কাছ থেকে নেয়া টাটকা চিংড়ি মাছ ভুনা আর আলু বেগুনের তরকারী রান্নার ঘ্রাণ যখন ছড়িয়ে পরছে তখন অভিযাত্রীদের অনেকেই গাছের ছায়ায় গামছা পেতে শরীর মেলে দিয়েছে । কয়েক জন নেমে পরেছে পাশের খালে ।দুরে কয়েকটা শেয়াল কৌতূহল নিয়ে দেখতে এসেও কি ভেবে ফিরে চলে যায়। সোনার চরে ভেজা শরিরেই জমপেশ খাইদাই হয়ে গেল সবার । মন ভরে দেখল সবাই সোনার চরের সৌন্দর্য ।

কথা বলে জানলাম কুয়াকাটার মত সোনার চর থেকেও সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় । তবে ভাটার সময় খালগুলি বরই বিপদ জনক ।খালের মুখ বড় দেখে একটা খালে আমারা ঢুকে যাই কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদম সরু থেকে সরু খালে পরিণত হয়ে যায় সেটি এবং ফিরতে গিয়ে দেখি নৌকা প্রাই আটকে যাচ্ছে খালে পানি না থাকায় । ভাটা চলে আশায় আমাদের মুল গন্তব্যে পৌঁছানোর খালও শুখিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে আমাদের চলতে হয় অজানা গন্তব্যের দিকে ।পথে মাঝিদের নৌকার সহায়তায় আরেকটি অপরূপ চর আণ্ডার খোঁজ পাই । সবাই চিন্তিত আর ক্লান্ত তাই আর খুঁজাখুঁজি না করে চর আণ্ডাতেই ক্যাম্প ফেলি।জানতে পারি সোনার চরের আশেপাশের চর গুলির মধ্যে চর তারুয়া, রূপার চর,আন্ডার চর, মৌডুবী, জাহাজ-মারা, তুফানিয়া, চর ফিড ও শিবচর অন্যতম। প্রতিটি চরের রয়েছে আলাদা আলাদা বিশিষ্ট এবং ভিন্ন ভিন্ন জিব বৈচিত্র্য।

শেষ রাতের খাইদাই জমল না ।খুদা পেটেই তাঁবুর নেটের দরজার যখন চেন লাগিয়ে দিচ্ছি তখন আকাশ সেজেছে হাজার কোটি তারায়। নিচে মাটি উপরে হাজার তারার মেলা আর মাঝে আমি । আমাদের মাঝে আর কিছু নাই । শূন্য ।
মহাশূন্য ।।

 লিখেছেনঃ Rahi
#TGBbookfair

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *