দ্যা ইয়াং ম্যান এন্ড দ্যা সী

ডিঙিতে চেপে গালফ স্ট্রীমে একাকী মাছ ধরে বেড়ায় এক বুড়ো। ৮৪ দিন হয় একটা মাছও পায় না।

গল্পটা কি পরিচিত ঠেকছে? হুম, আমাদের সবার পরিচিত ‘THE OLD MAN AND THE SEA’ এর শুরুটা এমনি ছিল।

সে গল্প আপাদত থাক। এখন না হয় The Young Men and The Sea! Tour Group BD’র সাথে “প্রবাল দ্বীপে অ্যাডভেঞ্চার” নামে একটা ইভেন্টে সেন্ট মার্টিন গিয়েছিলাম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। ‘সারা রাত সমুদ্রে কাটাব আর মাছ ধরব’, এটাই ছিল এ ট্রিপের মূল আকর্ষণ। ছোট বেলায় পড়া তিন গোয়েন্দার ‘অথৈ সাগর-১’ পড়ে যা কল্পনা করেছিলাম, সেটারই বাস্তবায়ন ঘটাতে!

এবার আসি মূল গল্পে। ১৩ ফেব্রুয়ারি। বসন্তের প্রথম দিন আর সেন্ট মার্টিনে আমাদের দ্বিতীয়। সেদিন রাতেই আমাদের মাছ ধরতে সমুদ্রে যাবার প্ল্যান। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। ফাল্গুনের রাত। মাথার উপর পঞ্চমীর চাঁদ। সন্ধ্যায় জানতে পারলাম রাত ১২ টায় আমরা বের হচ্ছি গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। সকাল থেকেই যে চাপা একটা উত্তেজনা ফিল করছিলাম সেটা আর চাপা থাকতে চাইল না, ঠেলে-ঠুলে বেরিয়ে যেতে লাগল!

আমরা ২২ জনের একটা টিম এসেছিলাম যাদের ১২-১৪ জনেরই ইচ্ছে ছিল মাছ ধরার নৌকায় রাত কাটানোর। কিন্তু সময় যতই গড়াচ্ছিল, রাত যতই গভীর হচ্ছিল, অভিযাত্রীদের সংখ্যাটা ততই কমছিল! শেষমেশ তা ৫ জনে গিয়ে ঠেকল! বাকিরা কি তবে একটু বেশিই ভয় পেল?

রাত ১২: ৩৫ ! পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে গেছে অনেক আগেই। চারপাশে জমাট বাঁধা অন্ধকার। বিশ্ববাসী যখন ভালবাসা দিবস (Valentine’s Day) পালনে মগ্ন, আমরা তখন সমুদ্রের উদ্দেশ্যে রওনা করেছি। সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমরা সমুদ্রের জলে নামলাম আর কথা দিয়ে এলাম সকাল বেলা ট্রলার ভর্তি করে মাছ নিয়ে ফিরব। এতো এতো মাছ ধরব যে সমুদ্র কয়েক দিনের জন্য মৎস্য শূন্য হয়ে যাবে!

সমুদ্রে তখন পূর্ণ জোয়ার। তীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে নোঙর করা ট্রলারটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আবছা অন্ধকারে ট্রলারটাকে ভুতুড়েই লাগছিল। হাঁটুর অধিক জল মাড়িয়ে আমরা যখন দুলতে থাকা ট্রলারে উঠলাম ঘড়িতে তখন ১২:৪০। ভট ভট শব্দ করে ট্রলার ছেড়ে দিল গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে।

ট্রলারে আমরা ৫ জন অভিযাত্রী। আর ট্রলার চলানো ও মাছ ধরায় পারদর্শী ৪ জন। এই চারজনের একজন ছিল ১১/১২ বছরের এক বালক। নাম আবদুল্লাহ। খুবই স্মার্ট ছেলে। তার স্মার্টনেসের পরিচয় পেয়েছিলাম মাছ ধরার সময়ে।

দ্বীপ থেকে বেশ দূরে মাছ পাব এমন একটা জায়গায় আমাদের ট্রলার নোঙর করল। নোঙর করা ট্রলারের গায়ে ঢেউ এসে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বাড়ি খাচ্ছিল। গভীর রাতে ট্রলারের গায়ে জলের এমন শব্দ আমাদের কাছে অপার্থিব। এ আমাদের চিরচেনা কোন শব্দ নয়। দূরে সেন্ট মার্টিনকে যদি চোখে না পড়ত তাহলে বলেই দিতাম সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অপার্থিব কোন এক জগতেই বুঝি চলে এসেছি।

ট্রলার নোঙর করার পর পরই আসল মাছ ধরার পালা। আমাদের মাছ ধরার সরঞ্জামাদির একটু পরিচয় দিয়ে নিই। প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ নাইলনের সূতা পেচানো। সূতার মাথায় বড়শি আর বড়শির একটু নিচে সূতায় ছোট একটা পাথর বাঁধা। পাথরটা বড়শিটাকে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। মাছ ধরার জন্য মাছের টোপ হিসেবে আমরা এনেছি ছোট ছোট কিছু মাছ। বড়শিতে টোপ গেঁথে সমুদ্রে ফেলি আর ধীরে ধীরে বোতল থেকে সূতা খুলে যেতে থাকে। তারপর সূতার একটা মাথা ধরে চাতকের মত অধীর অপেক্ষায় বসে থাকা।

আমার জন্য মাছ ধরার অভিজ্ঞতা এই প্রথম, তাও আবার সমুদ্রে, ভাবা যায়? আনন্দের অতিশায্যেই ভাসতে থাকলাম। সবাই বড়শি ফেলে প্রবল উত্তেজনায় বসে রইল। কারো বড়শিতে মাছ হয়তো ঠোকর দিয়েছে কিংবা আধার খেয়েছে, এতেই একেক জন আনন্দে ফেটে পড়বার মত অবস্থা। আমরা যখন বড়শি ফেলে মাছের অপেক্ষায় ততক্ষণে গ্রুপের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আবদুল্লাহ বড়শি ফেলার মিনিট পাঁচেকের মাথায় বড়শিতে মাছ গেঁথে ফেলল! সবার নজর সে মাছের দিকে, চোখে আনন্দের ঝিলিক। অভিযানের প্রথম সাফল্য বলে কথা।

মাঝিদের একজন বলল এটা বোল মাছ। এত সুন্দর একটা মাছের নাম বোল হলে কেমন লাগে? সবাই মিলে এর নাম দিয়ে দিল বিরল প্রজাতির মাছ! নামের মাঝেই একটা রহস্য রহস্য ভাব থাক। আবার আমরা বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে বড়শি ফেলে ধৈর্যের দুয়ারে কপাট দিয়ে বসে রইলাম!

মিনিট বিশেক পর আবারও আবদুল্লাহর ঝলক! মাছ সবার বড়শির আধার খেয়ে যায়, কারো বড়শি প্রবালের গায়ে আটকা পড়ে আর আবদুল্লাহর বড়শিতে মাছ পড়ে! আবার সবার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া। দ্বিতীয় মাছটা ছিল কোরাল প্রজাতির। মৎসাভিযানের প্রথম ঘন্টাতেই ২ টা মাছ। যদিও আমাদের পাঁচজনের বড়শিতে মাছ শুধু আধারই খেয়ে গেছে। কেউ কেউ মাছের টানটা টের পেয়েছে কিন্তু রাইট টাইমে টান দিতে না পারায় মাছ খাবার খেয়ে দিব্যি চলে গেছে। তবে এতে প্রবল আগ্রহে কারো কোন ভাটাই পড়ে নি! এদিকে আবদুল্লাহ ততক্ষণে ট্রলারে মাঝে জাল রাখার জায়গায় জালের উপর শুয়ে ঘুম।

The Old Man and The Sea এর বৃদ্ধ সান্তিয়াগো টানা ৮৪ দিন সমুদ্রে গিয়ে একটা মাছও পায় নি! আর আমরা সবে দু’ঘন্টা কাটিয়েছি, সকাল হতে আরো ঘন্টাতিনেক বাতি। দেখা যাক কি হয়। বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর সেই কথাটা একবার মনে মনে আওড়ালাম।

“Man is not made for defeat. Man can be destroyed, but not defeated!”

নোঙর তোলা হল। না, ফিরে যাবার জন্য না। আমরা এবার যাচ্ছি ছেঁড়া দ্বীপের দিকে। সেদিকে গেলে হয়তো মাছ পেতে পারি। ট্রলার ছাড়ল। নব উদ্দ্যমে বসে রইলাম। ট্রলার ভর্তি করে মাছ না ধরে ফিরছি না…

ভাগ্য আমাদের দিকে আর তার সুদৃষ্টি দেয়নি। হয়তো সে চায় এ বিদ্যেটা আমরা রপ্ত করে তারপরই যেন আসি।

একটা সময় বড়শি রেখে আবদুল্লাহর পাশে গিয়ে জালের উপর শুয়ে পড়লাম। মাথার উপর বিশাল আকাশ, অনন্ত নক্ষত্রবীথি! ঢেউয়ের তালে দুলছি আর তারা দেখছি। একটা সময় মনে হল সব স্থির, আকাশটাই দুলছে, অনন্ত নক্ষত্রবীথি দুলছে, সপ্তর্ষিমণ্ডল দুলছে। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মাঝে স্বর্গীয় আবেগ। এ সত্যিই আমাদের সেই চিরচেনা জগত নয়।

রাতের শেষ ভাগে এসে শীত লাগছিল খুব। শীতে সবাই মোটামুটি কাবু! একে তো কারো বড়শিতে মাছ উঠছে না, তার উপর আবার শীতের হস্তক্ষেপে মাছ ধরার প্রবল উৎসাহে ভাটা পড়ে গিয়েছিল। সবাই যে যার মত সমুদ্রের বুকে শেষ রাতের সৌন্দর্য দেখায় মনোনিবেশ করল। এমন রাত সব সময় কি আর আসে? সবাই তারা দেখতে দেখতে ভোর হবার অপেক্ষায়।

এক সময় তারাদের উজ্জল আলো ম্লান হতে শুরু করল। রাত-দিনের সন্ধিক্ষণের পবিত্র মুহূর্তে ট্রলারের নোঙর তোলা হল। ভট ভট শব্দে সে তীরে দিকে ছুটতে শুরু করল। আমরা যখন ট্রলার থেকে নামলাম ঘড়িতে তখন ৫:১০। শেষ হল মাঝ রাতে সমুদ্রে আমাদের ৪ ঘন্টা ৩০ মিনিটের মৎসাভিযান। আমাদের বিদায়ে, নয়তো বা ভাটায় সমুদ্র বড্ড শান্ত, কেমন যেন মন মরা।

বিদায় কখনোই আনন্দময় হয় না… সমুদ্রের প্রতি এক গভীর ভালাবাসা নিয়ে সেদিনই আমরা সেন্ট মার্টিনকে বিদায় জানিয়ে ছিলাম। পিছনে পড়ে রইল অদ্ভূত রাতের একটা গল্প।

Writer: Rafiqul Islam

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *