ব্যাকপ্যাকিং ট্রিপ টু সিলেট

২০১৬ এর ক্রিসমাসের ছুটিতে সিলেটের স্বল্পপরিচিত কিছু জায়গায় ঘুরতে চলে যাই আমি আর আমার বন্ধু সাব্বির। বন্ধের ৪-৫ দিন আগেও আমি ভেবেছিলাম আমাকে একাই যেতে হবে এই ট্যুরে। সাব্বির শেষ পর্যন্ত রাজি হওয়ায় রক্ষা। কোনমতে অনলাইনে এনা বাসের টিকেট পেলাম। কোথায় থাকবো তার ঠিক নেই। বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) রাতে ঢাকা মহাখালী বাস স্ট্যান্ড থেকে ব্যাকপ্যাক নিয়ে সুনামগঞ্জের বাসে উঠে পড়ি।

প্রথম দিন
শুক্রবার কনকনে শীতের মাঝে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা বাস থেকে নেমে যাই সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজের সামনে। ওখানে বাইক, অটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি বেশ কয়েকজনকে। আমরা দুজন দুটি বাইক ভাড়া নেই টেকেরঘাট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। এই অঞ্চলে বাইক হচ্ছে প্রধান বাহন। নতুন ব্রিজ পার হওয়ার পর যেন হারিয়ে গেলাম কুয়াশার রাজ্যে। বাইকের সামনে পাঁচ হাত দূরত্ব পর্যন্তও ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না ঘন কুয়াশায়। গায়ে একটা পাতলা জ্যাকেট আগে থেকে ছিল। কিন্তু ১০ মিনিট পথ যেতে না যেতে শরীর জমে যাচ্ছিল। তাই বাইক থামিয়ে ব্যাগ থেকে দ্বিতীয় জ্যাকেট বের করে পরে নিলাম আমি সাব্বির দুজনেই। যাদুকাটা নদী পর্যন্ত পথটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেলো। দুপাশে দীগন্ত ছোঁয়া মাঠের মাঝখান দিয়ে ছায়াপথের মত পিচঢালা রাস্তা। কুয়াশার সাথে যেন লুকোচুরি খেলছে এই পথ। চোখের সামনে হারিয়ে গিয়ে একটু দুরেই আবার নতুন সীমানার আভাস। দুপাশের মাঠে কোথাও গুচ্ছ গুচ্ছ ফসলের ধূসরে পায়চারি করছে গবাদি পশু। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে ধূসর মাঠ সোনালী রঙ ধারন করতে থাকে। এভাবে ৩০-৪০ মিনিট যাওয়ার পর শুরু হয় গ্রাম। গ্রাম পার হলে চলে আসি যাদুকাটা নদীর ধারে। বিশাল এক পাথুরে মাঠ পাড়ি দিয়ে যাদুকাটা নদীর পাড়ে এলাম। নৌকাঘাটে দাঁড়ালে ডানদিকে দূরে পাহাড়ের সারি, যা ইন্ডিয়ার মধ্যে পড়েছে। সীমান্তের ফাঁক দিয়ে সূর্যটা যখন উঁকি দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল পাথুরে মাঠটা যেন কোন সোনালী মরুভূমি। সারারাত কুয়াশায় ডুবে থেকে এখন জেগে উঠছে। আর সীমানা ধরে যাদুকাটা নদীর যাদুকরি স্বচ্ছ নীল। শীতের সকালের এমন উৎসবমুখর প্রকৃতি দেখার জন্য হলেও সবার একবার সুনামগঞ্জ যাওয়া উচিত।

বাইকসহ আমরা যাদুকাটা নদী পার হই ইঞ্জিনচালিত চওড়া ফেরী নৌকায়। নৌকা থেকে নামার পর কিছুটা ঢাল বেয়ে একটা টিলার উপরে উঠলাম। এখান থেকে আবার পিচঢালা পথ। এই টিলার ডানদিকের বেশকিছু অংশজুড়ে জায়গাটার নাম বারিক্কা টিলা। বারিক্কা টিলা ডানে রেখে আমরা সোজা এগিয়ে যাই টেকেরঘাটের দিকে। আরো আধা ঘন্টা যাওয়ার পর নীলাদ্রি লেকের পাড় ঘুরে আমরা টেকেরঘাট বাজারে গিয়ে বাইক বিদায় করে দেই। এখানে একটা লোকাল খাবারের দোকানে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে নেই। নাস্তা শেষে আমরা হাঁটতে হাঁটতে নীলাদ্রি লেকের পাড়ে চলে আসি। নীলাদ্রি লেক জায়গাটা একটা চোখের মত। তার দুই পাশের সবুজ টিলাগুলো যেন চোখের পাতা। এই টিলাগুলো একসময় চুনাপাথরের বিশাল খনি ছিল। এখনো এর চারপাশে পরিত্যাক্ত খনিজ পাথর উত্তলনের সরঞ্জাম, অফিস পড়ে আছে। লেকের এক পাশে ইন্ডিয়ার বর্ডার হওয়ায় ওই অংশটাতে যাওয়া যায় না। নীলাদ্রির নীল পানির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এর পাড় দিয়ে পুরোটা হাঁটলাম। পাড়ের দিকে কোথাও কোথাও লাল শাপলা ফুটে আছে। নীলাদ্রি লেকের পানির নীলটা অনেক গাড়, ময়ূরকণ্ঠী নীল।

লেকের ওখান থেকে আবার দুটো বাইক ভাড়া নেই আমরা। এরপর যাই টাঙ্গুয়ার হাওড়ে। যদিও টাঙ্গুয়ার বর্ষার রূপ বেশি জনপ্রিয়, শীতের রূপটাও কম সুন্দর না। একটা ছোট ট্রলার ভাড়া করে ঘন্টাখানেক টাঙ্গুয়ার স্বচ্ছ মার্বেল জলে ঘুরে বেড়াই। পানির নিচের জলজ গুল্মের রাজ্য পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। অতিথি পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে হাওড়ে। টাঙ্গুয়ার আকাশছোঁয়া জলের রাজ্য থেকে ফিরে আমরা আবার টেকেরঘাটের উপর দিয়ে তাহিরপুর বাজারে আসি। এখানে দুপুরের খাওয়া শেষে চলে আসি বারিক্কা টিলায়। বারিক্কা টিলার উপর থেকে যাদুকাটা নদীর আসল রূপ চোখে পড়ল। পাহাড় আর পাথুড়ে মাঠের মাঝ দিয়ে নদীটা যেন এক অলসভাবে পড়ে থাকা স্বচ্ছ নীল নেকলেস। তার উপরে ভেসে চলা নৌকাগুলো নেকলেসে লাগানো কালো কালো পাথড়।

এরপর আমাদের বাইকের ড্রাইভাররা বলল আমাদেরকে শিমুল বাগান দেখাতে নিয়ে যাবে। ওই সময় আমি এই শিমুল বাগানের কথা জানতাম না। এখন তো বেশ পরিচিত সুনামগঞ্জের এই শিমুল বাগান। যাদুকাটা নদীর পাড় ধরে ২০-৩০ মিনিটের মত গিয়ে ঢুকে গেলাম শিমুলের সবুজ বাগানে। ১০০ একরের বেশি জায়গায় সারিবদ্ধভাবে গাছ লাগিয়ে এই বাগান তৈরি করা হয়েছে। শীতে তখনও গাছগুলোতে শিমুল ফুল ধরে নি। আমাদের ড্রাইভার দুইজনের কাছ থেকে শুনলাম ফেব্রুয়ারি মার্চ এর দিকে শিমুল ফুলের লালে যে গাছগুলো ছেয়ে যায় সেগুলোই আবার এপ্রিলের দিকে সাদা তুলায় ভরে থাকে। শিমুল বাগান থেকে ১০-১৫ মিনিট এগিয়ে চোখে পড়ল সোনালী রঙের বাঁশবাগান। শীতের কারনে হোক আর যে কারনেই হোক বাঁশগাছের সবুজ দেখে অভ্যস্থ আমি এই সোনালী বাঁশবাগান দেখে বাইক থেকে নেমে যাই। কয়েক একর জায়গা জুড়ে থোকা থোকা করে লাগানো বাঁশগাছগুলোর পাতা শুকিয়ে এই ভিন্ন রঙের বাঁশবাগানটা তৈরি হয়েছে। বাইক ড্রাইভারদের তাড়ার কারণে এখানে অল্প সময় থেকে আমরা ফিরে যাই সুনামগঞ্জ শহরে। বাস টার্মিনালের কাছাকাছি হওয়ায় আমরা অল্প সময়ে হাসন রাজার বাড়ি কাম মিউজিয়ামটি ঘুরে আসি।

বিকেল ৫টার দিকে সুনামগঞ্জ থেকে বাসে উঠে আমরা রাত ৮টার দিকে সিলেট শহরে পৌঁছাই। বাস থেকে সোজা চলে যাই মাজার রোডে থাকার জন্য হোটেল খুঁজতে। রাস্তার মাথা থেকে একটা একটা করে হোটেলে খোঁজ নেয়া শুরু করলাম দুজনে ভাগ হয়ে। কোথাও রুম খালি নেই। এক হোটেলে তো ঢোকার আগে দারোয়ান বলে বসল – “স্যার ভিতরে গিয়া লাভ নাই, রুম পাইবেন না”। লম্বা বন্ধে আগে থেকে কিছু ঠিক না করে আসার ফল। ১০টার উপর হোটেল ঘোরার পর গলির ভিতরে এক হোটেলে পেলাম একটা রুম। রুম না দেখেই নিয়ে নেই, না হলে রাতটা রাস্তায় কাটাতে হতে পারে। মোটামুটি পরিস্কার রুম পেলাম তাতেই খুশি আমরা।

দ্বিতীয় দিন
শনিবার ভোর ৮টার মধ্যে সিলেট শিশু পার্কের সামনে গিয়ে জাফলংগামী লেগুনাতে উঠে পরি। লেগুনার হেল্পার পিচ্চিটা আমাদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল যে আমাদের জাফলং যাওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের গন্তব্য লালাখাল। তাই আমরা নেমে যাই সারিঘাটে। ঘাট থেকে বড় ছাউনি দেয়া ট্রলার নিয়ে লালাখালে নৌকা ভ্রমন শুরু হয় আমাদের। এই খালের স্বচ্ছ পানি বর্ণচোরার মত ক্ষনে ক্ষনে রূপ বদলায়। কিছুদূর পর্যন্ত কচি ঘাসের মত সবুজ পানি, এরপরেই আবার নীল হয়ে যাচ্ছে পানির রঙ। নীল আর সবুজ রঙের জলকাব্য দেখতে দেখতে দেড় ঘন্টা পর চলে আসি খালের বাংলাদেশের অংশের শেষ সীমানায়। এই জায়গাটাকেই মূলত লালাখাল বলে। এখানে পানি অনেক কম। দু তিনটা নৌকা আমাদের আগে এসে এখানে বসে আছে। মানুষজন এখানকার হাঁটু সমান পানিতে নেমে গোসল করছে। আমরা আগে পানিতে না নেমে ডান দিকের চা বাগানে উঠে যাই। চা বাগান পার হয়ে ইন্ডিয়ার দিকে আরেকটু এগোতে পেয়ে যাই বিশাল শরিষা ক্ষেত। এসব ঘুরে দেখে শেষে লালাখালের পানিতে হালকা গোসল করে নেই।

লালাখাল থেকে আবার সারিঘাটে ফেরত আসতে আমাদের দুপুর ১টার বেশি বেজে যায়। রাস্তার পাশের দোকানে কিছু খেয়ে ওখান থেকেই যাত্রা শুরু করি রাতারগুল যাওয়ার উদ্দেশ্যে। রাতারগুলেও সবাই বৃষ্টিতে আসে। আমরা গিয়ে পেলাম এর ভিন্ন চেহারা। রাতারগুলের প্রধান খালটাতে ঠিকই পানি আছে, কিন্তু জঙ্গল বেশিরভাগ শুকনো। নৌকা এক জায়গায় ভিড়িয়ে জঙ্গলের ভিতর আধা ঘন্টার মত হেঁটে আসলাম। চিরসবুজ গাছ আর গুল্মে ভরা মোটামুটি ঘন বনটা দেখে বোঝার উপায় নেই এটা জলবন হিসেবে পরিচিত। রাতারগুলের টাওয়ারের চারপাশটা শুকিয়ে মাঠ হয়ে ছিল। রাতারগুল বন থেকে বেরিয়ে নৌকা ঘাটের কাছের টিনের দোকানটাতে বসে সূর্যাস্ত দেখলাম। সবুজ বনের পেটের ভিতর লাল সূর্যটার হারিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে টের পাচ্ছিলাম পথের নেশা বড় নেশা। পথের নেশায় বুঁদ হয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসি অতিরিক্ত দামে ভাড়া নেয়া রূমটাতে। রাতে হোটেল রুমে বসে আমি আর সাব্বির দুজনে মিলে শেষদিনের ট্যুর প্ল্যান ঠিক করতে লাগলাম।

তৃতীয় দিন
শেষদিন মানে রবিবার আমাদের দুপুর ৩টার বাসে টিকেট কাটা। এই সময়টাতে আমরা ঠিক করলাম খুব সকালে উঠে হোটেল ছেড়ে দিয়ে জৈন্তাপুর শাপলার বিল দেখতে যাব। আগের দিনের মত লেগুনাতে চড়ে জাফলং এর পথে এগিয়ে গেলাম। রাতে ইন্টারনেটে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও খুব কম তথ্য পেয়েছি শাপলা বিল সম্পর্কে। লেগুনাতে করে গিয়ে নামলাম জৈন্তাপুর বাজারে। সেখান থেকে এক রিকশাওয়ালা নিজে দায়িত্ত নিলেন আমাদেরকে শাপলা বিল দেখিয়ে নিয়ে আসবেন। রিকশাতে ২০ মিনিটের মত পথ গিয়ে পেয়ে গেলাম জৈন্তাপুরের ডিবির হাওড়/বিল। মাঝখানে চওড়া মেঠোপথের দুই পাশে বিস্তৃত এই বিল। আর অদূরেই চোখে পড়ে পাহাড়ের সারি। বিলের শেষ মাথায় গিয়ে ডানদিকে নেমে নৌকা ভাড়া করি ১ ঘন্টার জন্য। বিলের আশপাশে কিছু বাড়িঘর আছে। বিলের পানিতে লাল শাপলার দাপটে পানি চোখে পড়া দায়। অজস্র শাপলা আর শাপলা পাতায় পুরো বিল জুড়ে যেন কোন রহস্যময় আলপোনা আঁকা। একদল হাঁস পানিতে নেমে আমাদের সামনে কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করল। একটু পর মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল অতিথি পাখির ঝাঁক। এরা বিলের পাড় জুড়ে থাকা লম্বা লম্বা বুনো ঘাসের বনে লুকিয়ে ছিল কোথাও।

জৈন্তাপুর থেকে সিলেটের দিকে ফেরার সময় আমরা দেখলাম আমাদের হাতে আরো ঘন্টা দুই সময় আছে ঘোরার মত। সাব্বিরের পরামর্শে সিলেট শহরের একটু আগেই নেমে গেলাম খাদিমনগরে। রাস্তার পাশ থেকে সিএনজি নিয়ে কিছু চা বাগান পেরিয়ে চলে যাই খাদিমনগর অভয়ারন্যে। এটি একটি রেইনফরেস্ট যা সরকারিভাবে জাতীয় উদ্যানের স্বীকৃতি পেয়েছে। ঢোকার মুখে একানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা আমাদেরকে বললেন গাইড ছাড়া বনের ভিতরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু তখন আশেপাশে গাইড না থাকায় আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বললেন। আমাদের সময়স্বল্পতার কথা বলে অনুরোধ করায় উনি আমাদের গাইড ছাড়া ঢুকতে দিলেন বনে। ঘন বনের মধ্যে এক দল বানরের দেখা পাই মাঝপথে। কেমন নিস্তব্ধ একটা পরিবেশ এখানে। অনেক জায়গাতে বন এতোটাই ঘন যে সূর্যের আলো চোখে পড়া দায়। কত নাম না জানা গাছের পাহাড়ায় এই নৈশ্যব্দ জমে আছে এখানে কত বছর ধরে কে জানে! জঙ্গলের গহীনে আবার দুটো বোমঘর আছে। যেখানে নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় মর্টার শেল লুকিয়ে রাখা হত। সেখানে ঢোকার সময় কাঁটাযুক্ত গাছের একটা ঝোপ পেরোতে গিয়ে সাব্বিরের মাথার তালু কতখানি কেটে যায়। খাদিমনগর অভয়ারন্য দেখে বের হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বাস স্ট্যান্ডে চলে যাই ফিরতি বাস ধরতে।

নিজেদের মত করে এমন ব্যাকপ্যাক নিয়ে এলোমেলো ঘোরার মজাটা অন্য রকম। জীবন আমার মনে হয় না কারো ঘরে এসে ধরা দেয়। জীবন লুকিয়ে আছে ওই পথে, পথের নেশায় হারিয়ে গিয়ে তাকে খুঁজে পেতে হয়।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *