সান্দাকফু ও ফালুট নামা

মানেভাঞ্জান থেকে তুমলিং

মানেভাঞ্জানের সকাল । তাপমাত্রা প্রায় ৭/৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি হবে । এমনি এক শীতের সকালে যেখানে কম্বল মুরি দিয়ে দুপুর পর্যন্ত শুয়ে থাকার কথা সেখানে সেতু আপু সকাল পাঁচটা ত্রিশে ডেকে উঠালো ।

কিছু চেনা অচেনা মুখের ৮ জনের একটি দল নিয়ে ট্যুর গ্রুপ বিডি প্রস্তুত এবার সান্দাকফু ফালুট অভিমুখে যাত্রা শুরু করবে । চোখে মুখে সবার উত্তেজনা কখন শুরু হবে আমাদের বহু প্রতীক্ষার সান্দাকফু ট্রেকিং। সেই কবে পড়ে ছিলাম গর্ভধারিণী উপন্যাস। চার অভিযাত্রীর সান্দাকফু ফালুট হয়ে চ্যাংথাপু গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা । সেদিন থেকেই তো আসলে মাথায় পোকা হয়ে আছে এই ট্রেইল ।কবে যাবো সান্দাকফু ,কবে যাবো ফালুট !!ট্যুর টি হওয়া না হওয়া নিয়েও ছিলো নানা মত নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব । এর মাঝে ইন্ডিয়ার পোর্টের বিষয়টি তো ছিলোই । যাই হোক সব বাঁধা পার করে যখন আমরা মানেভাঞ্জান পৌঁছলাম তখন একমাত্র বাঁধা মনে হচ্ছিলো তাপমাত্রা ।

যার ধারণা সমরেশ মজুমদার তার গল্পেও বলেছিলেন । আমারা আসলে ঠাণ্ডা বলতে যা বুঝি এর কাছে তার সবই নস্যি 🙂 ঢাকা থাকার সময় ইউট্যুব সহ বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ে একটা ধারণা হয়েছিলো তাপমাত্রা কম থাকবে এবং গরম কাপড় নিতে হবে । কিন্তু পরিবেশের সম্মুখীন হবার পর বুঝতে পারলাম আর্টিকেলের সাজেশন আর ইউট্যুবের নির্দেশনার তেমন গুরুত্ব আসলে আমারা দেই নাই। কাজেই সকালে সবাইকে মানেভাঞ্জান থেকে আবার শপিং করতে হল ।এইবার গাইড আর অনুমতি নেয়ার পালা।


দাওয়া নাম আমাদের গাইডের।বয়স ৩৩ এর মত। একটু পাগল পাগল মনে হলেও ওর প্ল্যানিং পারফেক্ট মনে হল । দেরি না করে বেড়িয়ে পরলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য চিত্রে হয়ে তুমলিং এর উদ্দেশ্যে। মানেভাঞ্জান থেকেই খারা ঢালের ঝিক ঝ্যাক রাস্তা ধরে প্রায় দের ঘণ্টার অধিক সময় নিয়ে বিরক্তিকর গাড়ি চলার পথ পারি দিয়ে আমরা চিত্রে পোঁছালাম তখন ১০.৩০ এর উপরে বাজে।

চিত্রে থেকেই মূলত ট্রেকিং এর মজা পাওয়া শুরু হয় ।এখান থেকে পাহাড়ের উঁচু চুড়ায় মেঘ আর সূর্যের  আলোর লুকোচুরি খেলা বরই মনোমুগ্ধকর । গাইডের কথায় আমারা মুল রাস্তা থেকে মাঝে মাঝেই শর্ট কার্ট নিচ্ছি । ছোট ছোট অচেনা গাছরে ঝোপের মাঝ দিয়ে রাস্তা । আঁকা বাঁকা কখনো উঁচু কখনো নিচু রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছি । আজিম ভাইয়ের সাথে থাকা জিপিএস মাঝে মাঝেই খেয়াল করছি । উঠতে হবে ১১৯২৯ ফিট । শুরু করেছি ৭০৫৪ ফিট থেকে । যখন লামেধুরা চলে এলাম তখন আমাদের পথের উচ্চতা দেখাচ্ছে ৮৪৮৪ ফিট যা মুল উচ্চতার বেশ কিছু কম । মাঝে মাঝেই এমন হচ্ছিলো । আমারা আমাদের কাছে থাকা ম্যাপে লোকেশন গুলার উচ্চতা যেমন দেখেছিলাম তেমন পাচ্ছিলাম না।কখনো ৫০ কখনো আরো বেশি ফিট কম বেশি হচ্ছিলো।

যেহেতু আমি নিজেও এত ভাল বুঝি না তাই এ দিকে গুরুত্ব না দিয়ে যেটা বুঝি অর্থাৎ ভাল ভাল ছবি তুলতে হবে তার দিকে মনোযোগ দিলাম 🙂 । পথে কাঞ্চন মামা একবার উঁকি দিয়ে আবার মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল । এই সময়ে এত মেঘ আকাশে !! আমাদের ভাগ্য সুবিধার না তারি আভাষ পাচ্ছিলাম।


মেঘমা পার হয়ে যখন তুমলিংএর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি তখন সহযাত্রী হিসেবে পেলাম দুইজন বিদেশী, পিটার এবং জুলিয়া ।
অমানুষের মত হেটে চলেছে তারা । আমারা শুরু করেছি সকাল ৯ টায় আর তারা ১২ টায় । অত্যান্ত আন্তরিক ছিলো তারা কিন্তু সাথে হেটে পারলাম না বিধায় আড্ডা জমল না । পরে অবশ্য তুমলিং এ আমাদের রিসোর্টেই তাদের সাথে দেখা হয় । রিসোর্ট না বলে হোম স্টে বলাই যুক্তিযুক্ত । নির্মাণ শৈলী দারুন।
ফুলগাছে সজ্জিত বাড়ির আঙ্গিনাটা আমার ভীষণ পছন্দ হয় ।মনে হয় আমাদের সহযাত্রী এবং বিদেশী বন্ধুদেরো মনের অবস্থা তাই। এখানেই আমাদের দু পক্ষের মাঝে গপ্প গুজব হয় ।
জানতে পারি একজন জার্মান এবং একজন অ্যামেরিকান ।গতবছর বালিতে গিয়ে তাদের পরিচয় হয় । এর পর থেকে ঘুরে চলছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে । জুলিয়ার ঘোরার আগ্রহটা একটু বেশি পর্জায়ে । ঘোরাঘুরির সুবিধার্থে সে বিভিন্ন দেশের এনজিওতে পার্ট টাইম জব নিয়ে নেয় ।এর পর খুব কাছ থেকে দেশ দেখে ।

আমি সিঙ্গেল দেখে পিটার আমাকেও বালি যাবার পরামর্শ দেয়। সেখানেই নাকি অপেক্ষা করছে আমার জয়ীতা । 😛

ট্রাভেলিং এ আসলে এমন ক্ষণিকের পরিচয় গপ্ল গুজব আমার ভীষণ পছন্দ ।যখন বসে ভাবী তখন আসলে ট্রেইলের কথা মনে পরে না ,মনে পরে কোন গ্রামে পরিচয় হওয়া কোন দাদা/দিদি অথবা তাদের ফুটফুটে আদুরে বাচ্চাটির কথা , তাদের সাথে পারকরা সময় গুলো অথবা কর্তব্যরত কোন সৈনিকের সাথে দু দণ্ডের কথপকথন অথবা পথে পরিচয় হওয়া কোন অভিযাত্রী যে কিনা আমার মতই পাগল ।

তুমলিং থেকে কালাপোখারি।

কোলকাতা থেকেও পাঁচজনের একটা গ্রুপ এসেছে যারাও আমাদের মত ট্রেকিং করে ফালুট যাবে। সান্দাকফু দুইরাত এবং ফালুটেও দুই রাত থাকবে। প্লানটা দারুন। কথায় কথায় তাদের সাথেও খাতির হয়ে যায়। চা ,নাস্তা, দুপুরের খাবার রেস্ট ইত্যাদির কাড়নে ট্রেইলে কখনো তারা সামনে আবার কখনো আমরা সামনে চলে আসছিলাম। এইভাবেই সময় কেটে যাচ্ছিলো।

তুমলিং থেকে কালাপখরী প্রায় ১৩ কি.মি। ৭ কি.মি পর গাইরিবাসে বিশ্রাম অর্থাৎ এখানে দুপুরের খাবারের কথা বলে দিয়েছে আমাদের গাইড “দাওয়া খানা”। নাম মনে রাখতে আমি অর নামের সাথে প্রথম দিকে দাওয়া আর খানা একসাথে করে মনে রাখতাম। এর আগে একবার সোনামপেডেং এ যার বাসায় ছিলাম তার নাম ছিলো মান বাহা। মনে রাখার জন্য নিজে নিজে উচ্চারণ করতাম “মান বাহা যায়ে”।

তুমলিং থেকে একটা রাস্তা গিয়েছে নেপাল হয়ে আরেকটা গাড়ির রাস্তা ইন্ডিয়ার বর্ডার ঘেঁষে একেবেকে শেষে দুইটি রাস্তা গাইরিবাস গিয়েই মিলেছে। শর্ট কার্ট রাস্তা আর বাধা না থাকায় আমারা শুধুমাত্র এন্ট্রি করে নেপাল হয়ে যে রাস্তা গিয়েছে সেই রাস্তায় ঢুকে গেলাম।

যাত্রা পথে যত গুলি চেকপোস্ট পেয়েছি তার সবখানেই পেয়েছি আন্তরিকতার ছোঁয়া। এই দূর বর্ডারে বাড়ি ঘড় ছেড়ে তারাও যেন বসে আছে অভিযাত্রীদের সাথে দুদণ্ড কথা বলার জন্য।

আমাদের সময় কম তাই হাই হ্যালো বলেই ফের হাটা শুরু। জোবাড়ি/জওবাড়ি গ্রামের এভারেস্ট লডযে আমারা চা বিস্কুট পর্ব সেরে আবার ইন্ডিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করি। যতই উপড়ে উঠতে থাকা যায় খাবারের ভেরিয়েশন কমতে থাকে আর দামও বাড়তে থাকে। তবে আন্তরিকতা বাড়ে। এইটা কমলে এত মানুষ এ রাস্তায় বার বার আসত না।চাপ কম একারণেই হয়ত। আমারা যদি বুড়িমারীর বুড়ির হোটেল থেকে শুরু করি তাহলে বলতে হয় বুড়ি চাচী চাপ সামলাতে না পেরে কাস্টমারদের কি ঝারির উপরেই না রাখে। ইদানীং উনার রাগের পরিমাণ অসম্ভব রকম বেড়েছে। একবার তো বলেই বসলাম “চাচি লাঠি নেন তো একটা হাতে। যেই বেশি খাবার চাবো মাইর লাগাবেন” 🙂 কোন উত্তর পাই নাই। উত্তর, মাইর কোনটাই দেয়ার সময় নাই উনার।

গাইরিবাস যখন এলাম তখন বেলা ১২ টা। এখানেও আন্ডাকারি ( ডিমকারি) খেতে হবে শুনে মনখারাপ হয়ে গেল !! উপায় না দেখে দিদিদের রিকুয়েস্ট করলাম একটা মুরগী দিতে। দিল তবে বলল ” মার্ডার তুমকো কারনা পারেগা” ।জবাই করার দায় দাইত্ত তারা নিতে চাইলো না। কি আর করা সাথে থাকা ম্যাকগাইভার চাকু ধার দিয়ে নিজেই লেগে গেলাম মার্ডার করতে এর পরের দাইত্ত সাথে থাকা একমাত্র আপা সেতু  আর টুটুল ভাইয়ের উপর চাপায় দিয়ে আমি গেলাম এক পিচ্চির সাথে গল্প করতে। ২০ মিনিটে মুরগী প্রসেসিং + রান্না রেডি।

খেতে গিয়ে মনে হল মানুষই আসলে সবচেয়ে খাতরনাক আর হিংস্র প্রাণী এ জগতে। একটা তাজা প্রাণ নাশ করে তারে ২০ মিনিটের মাথায় প্রসেসিং করে, লবণ,হলুদ,মরিচ এবং নানা মশল্লা লাগিয়ে তার গলধকরন আহা হা!

খাবার শেষে ১৫ মিনিট রেস্ট।এখান থেকে উপড়ে উঠতে হবে প্রায় ২.৩০ কি.মি। মোটামুটি ভালো খারা এইটুকু রাস্তা। দুপুরে খাবার পর হাটা কষ্টকর কাজ গুলার মধ্যে একটা। আমার তো দুপুরে খাবার পরেই ঘুম চলে আসে। ঘুম ভাঙাতে গান ছেড়ে হাটতে লাগলাম। রাত্রি ক্লান্ত জীর্ণ শীর্ণ আধো আলো _ _ গান বেজে চলেছে আর আমিও চলছি দুলে দুলে।

বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছে না। ৫/১০ মিনিট পর পর রেস্ট নিতে হচ্ছে সবার। রাস্তায় মাঝে মাঝেই ব্যানার দেয়া “সেইফ রেড পাণ্ডা” কিন্তু তাদের দেখা পেলাম না। লজ্যায় লুখিয়ে আছে কোথাও হয়ত। তবে পথে চোখে পড়ল এক দুর্লভ প্রজাতির মুরগীর ন্যায় দেখতে Satyr Tragopan পাখি আর লম্বা লেজ ওয়ালা শালিকের নেয় দেখতে winged Magpie পাখি ।

যখন উপরে চলে আসি অর্থাৎ কায়াকাট্টা তখন আকাশে কালো মেঘ ঢেকে নিয়েছে। ” ইধার মসাম কা কই ভরসা নেহি হায়’ গাইড তাগাদা দিলো । ঠাণ্ডাও বেড়ে যাচ্ছিলো। একপর্যায়ে গিয়ে মেঘের পরিমাণ এত ছিলো যে আমারা অভিযাত্রীদের সবাইকে দেখতে পাচ্ছিলাম না এক সাথে। গ্রিক ভাই মেহদী আমার পেছনে তার পরে কে আর দেখছি না ।(এ নামের পেছনের গল্প: একদল বিদেশি তাকে দেখে ইউরোপিয়ান মনে করে বলেছিলো “ওয়ান ইউরোপিয়ান অলসো ইন ইউর টিম ? “। আমিও তাল মিলেয়ে মেরে দিলাম,ইয়েস ইয়েস, উনি গ্রিস থেকে এসেছেন। উনার লম্বা দাড়ি আর গেটাফ অনেকটা গ্রিস থেকে আসা টুরিস্ট দের মত কিনা ।

কালাপোখারি লেকে চলে আসলাম তখন বিকেল ৪ টা হবে। এত উপড়ে লেক সত্যি আশ্চর্যজনক। ওয়েদারের অবস্থা খুবই খারাপ মনে হচ্ছে রাত নামবে এমন।এখানে সাগরের বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো।এসে রাতের খাবারের কথা বলেই লেপ কাঁথা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পরলাম। ঠাণ্ডায় কাঁপছি সবাই।

ঘুম ঘুম ভাব হলো কিন্তু ঘুম এলো না। শুধু গাইডের বলা কালাপোখারি লেক নিয়ে অলৌকিক কথা গুলো মনে পড়তে লাগল।

(সে অনেক অনেক দিন আগের কথা । যখন দুইটা কালো পাখি থাকত এই লেকে এবং _ _ )

কালাপোখারি থেকে সান্দাকফু।

কালাপোখারিতে খুব ভোরে সবার ঘুম ভেঙ্গে যায় । যাবেই বা না কেন রাত ৮ টার পরেই তো সবাই নাক ডেকে ঘুম দিয়েছিলো। নাক ডাকার এই বিশ্রী অভিযোগ এইবার অন্য সবার সাথে সাথে আমার নামেও আসল । এবং বিশ্বাস না করে পারলাম না 🙁 ।

দরজা খুলে যখন বাইরে আসলাম তখন আমাদের অভিযাত্রীদের সবাই গরম পানির জন্য অপেক্ষা করছে ফ্রেস হবে বলে ।নাস্তার অর্ডার দিয়ে মুখ না ধুয়েই বেড়িয়ে পরলাম আমি। লক্ষ করলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার দিক অর্থাৎ উত্তর দিক ছাড়া বাকি সব পাশের আকাশ পরিষ্কার। দুর্ভাগ্য যাকে বলে ।

Kalapokhari

কালাপোখারি লেক থেকে সাগর লডজ ৫ মিনিটের উল্টা হাটা পথ ।পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ঐ দিকেই হাটা দিলাম । সাথে পেলাম কলকাতার সেই পাঁচ দাদা কে। তারাও যাচ্ছে লেকের পারে । তাদের কথা বলার ভঙ্গি বেশ মজার ছিলো । কালাপখারি লেক নিয়ে তাদেরও ছিলো নানা গল্প এর মধ্যে দুই পাখির গল্পও ছিলো ।সম্ভাব্য তাদের গাইডের কাছ থেকে শুনেছে । মিথটা কিছুটা এইরকম । এই লেকের উপরে থাকত দুটি কালো পাখি । তারা লেকের পানিতে কোন পাতা পর্যন্ত পরে থাকতে দিত না । পাতা পরলেই নাকি মুখ দিয়ে তুলে ফেলত । এটি একটা পবিত্র লেক । এখন পাখি না থাকলেও লেকের পানি নাকি পরিষ্কার । ৪ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় এই ঠাণ্ডা পানি পরীক্ষা করার কোন ইচ্ছা বা সাহস আমি পেলাম না । বরং আমাদের অভিযাত্রীরা চলে এসেছে ,এখন তাদের সাথে ছবি না তুললেই নয় ।

কালাপোখারি থেকে সান্দাকফু মাত্র ৬ কি.মি দূরত্বে। মাঝে একটি ছোট গ্রাম রয়েছে যেখানে চা নাস্তা সারবো এবং দুপুরের খাবার সান্দাকফুতে গিয়ে খাব এমন পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করলাম আবার হাটা। যাত্রা পথে মাঝে মাঝেই পেলাম “ইউজ মি” লেখা টিনের বক্স , লক্ষ করার মত একটা বিষয় । ময়লা আবর্জনার প্রতি গোর্খারা যথেষ্ট সচেতন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গাইডরাও দেখলাম পরিবেশ নিয়েও বেশ সচেতন । আমাদের গাইডতো পাথুরে রাস্থাকে পাকা রাস্তায় পরিণত করার বিপক্ষে ।সে অনেকদিন থেকে এখানে গাইডের কাজ করছে । ৫/৬ বছর আগেও নাকি তুষার পাতের পরিমাণ ভাল ছিলো, এখন কমে গেছে আর বরফ আগে কম পরত এখন বেশি । উল্লেখ্য বরফ পরে তাপমাত্রা -২/৩ বা এর কম হলে কিন্তু তুষার পরে ০/১ ডি.সে. তাপমাত্রায় । আর বন্য প্রাণী গুলোকে প্রাই ট্রেইলের আশেপাশে দেখা যেত ।রাস্তায় গাড়ি চলাচল হওয়ায় তারা এখন ধারের কাছেও নাই ।

সান্দাকফু উঠতে আর ৩ কি.মিটার বাকি তখন । উপরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তা বেড়ে গেল। মোটামুটি ভালই খাড়া । গাড়ির রাস্তা দিয়ে শুরু করলাম উঠা । সুযোগ পেলেই ছোট খাটো শর্টকাট খুঁজে নিয়ে এগোচ্ছি ধীরে ধীরে সামনের দিকে ।দুই দিনের ট্রেকিং এর পর এখন আমারা অনেক চালাক । কারো মাঝে আর তারাহুরা নাই । কথায় আছে “তারা তারি যাইতে চাইলে সময় বুঝে আসতে আসতে যান ” কথাটা যেন পাহাড়ে উঠার জন্য একদম মানানসই কথা।

মেঘ আর বাতাসের পরিমাণ যত উপরে উঠছি যেন আসতে আসতে বাড়ছে ।সেই সাথে বাড়ছে ঠাণ্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার কষ্ট ।অনেক উপড়ে তখন মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় সান্দাকফুর একটা রিসোর্ট ।আজিম ভাইয়ের মাংকি ক্যাপের দিকে হঠাৎ চোখ চলে যায়,দেখি মুখের যায়গায় শিশির জমার মত হয়েছে । নিশ্চিত আমারটাতেও সেইম অবস্তা !বাতাস ঠাণ্ডা হবার কারনে মুখের সামনে মাংকি ক্যাপের একটা অংশ টেনে নিয়েছিলাম। হাত মোজা দিয়ে সেই অংশ থেকে শিশির মুছে নিলাম ।

অবশেষে সামনে পেয়ে গেলাম সান্দাকফু জিরো কি.মি 🙂 ।খুশি হতে গিয়েও হতে পারলাম না। এর পরেই আসলে ট্রাজিটি শুরু ।পথ যে আরো বাকি ! গন্তব্যের দূরত জিরো দেখার পরে এমনেতেই শরীর ছেড়ে দেয় এর পর খারা পথ পারি দেয়া । খুব কষ্টের । আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো । ইচ্ছা ছিলো বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে জিরো লেখা স্তম্ভের কাছে একটা ছবি নেব রাগের মাথায় বেমালুম ভুলে গেলাম ।

গাইডকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম রুম আর খাবার অর্ডার দেয়ার জন্য । এখন আমি নিজেই গাইড । অদূরে গন্তব্য নিচে অচল পা নিয়ে আমি । অবশেষে মানুষিক শক্তির কাছে সশরীরের অক্ষমতা পরাজিত হল । পৌঁছে গেলাম সান্দাকফু । যেখানে আমাদের রুম নেয়া । গিয়েই রুম ডিস্ট্রিবিউশন করে দিয়ে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে সোজা রান্না ঘরে । না খাবার জন্য না । আগুন তাপানোর জন্য । পা আর হাত মারাত্মক রকম ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিলো । পায়ের মোজা কখন যেন ভিজে গিয়েছিলো বুঝি নাই । এ কাড়নেই ঠাণ্ডা বেশি লাগছিলো । মনে হচ্ছিলো পায়ের পাতায় বোধ শক্তি আর অবশিষ্ট নাই ।

দুপুরের খাবার খেয়ে দুপুরটা ঘুমিয়ে কাটালাম সন্ধ্যেয় ঘড় থেকে বের হলাম । চারদিকে মেঘে ঢেকে আছে সান্দাকফুতে, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। এন্ট্রি করতে ক্যাম্পে গেলাম ।লেখার সময় খেয়াল করলাম হঠাৎ হঠাৎ ইউরিয়া দানার মত ছোট ছোট বরফ পরছে । বরফ পড়ার মাত্রা হালকা বেড়ে গেল । সেই সাথে ঠাণ্ডা । ক্যাম্প এরিয়া থেকে ।বলতে গেলে দৌরে ফিরে এলাম আমাদের ডেরায় ।

স্লিপিং বোদ্ধা।

রাত ৩ টার দিকে এক সহযাত্রীর নড়াচড়া টের পেয়ে চোখ খুললাম। দেখি বিস্কুট খাচ্ছে। তাকে দেখে ক্যামন ক্লান্ত ক্লান্ত লাগছে। চোখ বুজেছি কতক্ষণ হবে জানি না বমির আওয়াজ পেয়ে লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে পরি। দেখি উনি বমি করতে চাচ্ছে কিন্তু হচ্ছে না। এবং সে অসস্থি ফিল করতেছে বুঝা যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে আবার ঘুমিয়ে পরি।ভোর ৫.৩০ এ ঘুম ভাঙে গাইডের ডাকে ” উঠো কাঞ্চনজঙ্ঘা দিখ রাহা হায়”।

আর যায় কই সবাই রে জাগাইলাম। সবার মনে আনন্দ। বাইরে বেরিয়ে আসবার জন্য সিঁড়িতে পা দিয়ে ছি কি অমনি সিরিতে জমা বরফে পিছলা খেতে খেতে রক্ষা পাই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক স্থানেই বরফ জমে রয়েছে। দূরে তাকিয়ে দেখতে পেলাম সাদা পাহার। কিন্তু অস্পষ্ট। হতাশ হলাম। পঞ্চগড় থেকেও তো এমনি দেখা যায়। এ কেমন কথা হলো!!গাইড ভিউ পয়েন্টের দিকে নিয়ে গেল। একি এদিকে তো দেখছি একদম হাতের মুঠায় স্লিপিং বোদ্ধা। একদিন হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যাবে এমন মনে হচ্ছে। এতক্ষণ কি দেখলাম তাহলে। গাইড আঙুল তাক করে বলল ” আপ বাংলো সে জো পেহেলে দিখা বো এ হে, মাকালু (নেপাল ও চিনের সীমান্তে অবস্থিত পৃথিবীর পঞ্চম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ মাকালু। উচ্চতা ২৭৮৩৮ ফিট) উছকে পিছে লৎসে (নেপাল ও চিনের সীমান্তে অবস্থিত পৃথিবীর ৪চতুর্থতম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ । উচ্চতা ২৭৯৪০ ফিট) অর ইন দোনো কে বিজ হাল্কা-ছা দিখরাহা এভারেস্ট ( ২৯০২৯ ফিটা উচ্চতা) অর এ দেখিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ( ২৮১৬৯ ফিট ।পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম) অর মাকালু কে বিজ হ্যাঁ থ্রি সিস্টার। আপ কা লাক বহত আচ্ছা হায়।সাব দিখরাহা হায় আজ “। আমারে আর পায় কে। ক্যামেরা চালু করলাম ধামা ধাম ছবি তোলা শুরু। ২০ টা ছবি তুলেছি কি দেখি ক্যামেরায় চার্জ অর্ধেকে নাই। এই ব্যাটারি কেবল তুলেছি। বাংলাদেশ থেকে দুইটা ব্যাটারি নিয়ে এসেছিলাম।যার একটা সুধু কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ ধরবার জন্য। কিন্তু চার্জ ক্যামনে হাওয়া হলো।ক্যামনে কি!!

ততোক্ষণে সূর্যের লাল আভা পরতে শুরু করেছে স্লিপিং বোদ্ধার পায়ে এর পর পেটে এর পর মুখে। লাল হয়ে উঠছে বোদ্ধা। আহা কি রূপ। সকল ক্লান্তি মুছে গেল। বাম দিকের মাকালুও বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এভারেস্ট ভাল বুঝা জাচ্ছে না একটা বাইনোকুলার খুব মিস করছিলাম। অভিযাত্রীরা সবাই অবাক হয়ে দেখছিলো সাদা পাহাড় গুলার রূপ।

এরই মাঝে গাইড আমাকে ডেকে নিয়ে গেল রান্না ঘড়ে। সে বুঝতে পেড়েছে দলের দুইজনের অবস্থা খারাপ। বরফের মধ্যদিয়ে এই দুইজনকে নিয়ে ফালুট যাওয়া উচিৎ হবে না। আমি হা না কিছু না বলে বাইরে চলে এলাম। ঘড়ে গিয়ে দেখলাম দুইজনের একজনের মাথা ব্যথা ভাল হয়নাই আর অন্য জনের মাথা ব্যথা আর বমি বমি ভাব আছেই। কি করব বুঝতেছি না। একটা স্বপ্নের এইবাবে শেষ মেনে নিতে পারছিলাম না। আবার ভিউ পয়েন্টে গেলাম। দেখতে পেলাম ফালুটের রাস্তায় এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে সাদা অর্থাৎ বরফ। কলকাতার দাদা দের সাথে ফের দেখা হলো। আমারা কি করছি জানতে চাইলো। আমি বললাম ফালুট যাচ্ছি। দাদাদের একজন রসিকতা করে জবাবে বলল ” দাদা তোমাদের কি কামরায় ?

এই ঠাণ্ডায় অদিকটায় গিয়ে বিপদে পরতে চাও নাকি?”

গাইড থেকে শুরু করে রিসোর্ট এর কেয়ারটেকার সবাই একই কথা বলছিলো ” এয়সে হাল মে যাওগে তো ফাস যাওগে ইয়ার।ইত্নি ঠাণ্ডমে অক্সিজেন কি প্রব্লেম ছে এ সাব হো রাহা হায়। আব উন দোনো কো নিচে লেনা চাইয়ে। ইচ্ছে গারমি ভি পাওগে অর বো লোক ঠিক ভি হো জায়ে গা ” হাল ছেড়ে দিলাম।এমন পরিস্থিতি আসলে যে কারো হতে পারে। আমারো হতে পারত। তাদের আগে সুস্থ করতে হবে। এইটাই মাথায় কাজ করছে আমার তখন। বাকি অভিযাত্রীদের সবার সাথে বসে তাতক্ষনিক সিদ্ধান্তে ঠিক হলো আমরা ডাউন রুটে স্রিখোলা চলে যাবো এর পর অসুস্থদের সেইফ লোকেশনে পৌঁছাব এর পর যা হয় দেখা যাবে।

নাস্তা সেরে শ্রীখোলা যাবার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। সান্দাকফু থেকে শ্রীখোলা প্রায় ১৬ কি.মি সবটাই বনের ভেতর দিয়ে ডাউন ট্রেক।

ততক্ষণে মেঘের চাদর ঢেকে নিতে শুরু করেছে ঘুমন্ত বোদ্ধাকে। মাকালু হারিয়ে গেছে আরো আগেই।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *