হামহামের পথে আমরা ১১ জন

এক ছোট ভাই সহ একটা নাইট ট্রিপ (পৌছে চা-নাস্তা খেয়ে একটু ঘুরাফেরা করে চলে আসবো) এর কথা চিন্তা করছিলাম। আমি বললাম চট্টগ্রাম সেও রাজি হল কিন্তু কিছুক্ষন পরে মত ঘুরিয়ে বললো ভাই চলো শ্রীমঙ্গল যাই! মনে মনে চিন্তা করলাম শ্রীমঙ্গল গেলে হামহাম’ই এবারের টার্গেট।

কথা ফাইনাল, সাথে আরো দুইজন (মোট চারজন হলাম) রাজী হয়ে গেল। সব ঠিকঠাক, আমরা যাচ্ছি কিন্তু মাঝ থেকে একজন এসে বাধ সাধলো, ভাই আমারে না নিয়া যাইয়োনা। প্ল্যান আগামী সপ্তাহে করো আমি যাবো! অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সবার সম্মতি/অসস্মতিতে ট্যুর এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিলাম!

এবার আমাদের সাথে আরো অনেকেই যাবে বলে রেডি, টিমের সাইজ ১১ জনে ফিক্সড হয়ে গেল। সময়মত ট্রেনের টিকিট না পেয়ে একটি মাইক্রোবাস বাস ভাড়া করে সবাই মনে মনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

১১ জনের সবাই হামহামে নতুন! এমনকি যাওয়ার পথ কেমন সে ব্যাপারেও খুব ভাল ধারনা কারোরই নাই!!

বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে সাজেশন চাইতেই বিভিন্ন লোক নানান রকম ভয় দেখাতে লাগলো! 🙁
শুরু হলো জল্পনাকল্পনা! দুই একজন নড়েচড়ে বসলো! বলে ভাই যাইতাম না! No…

আমি ব্যাপারটাকে একটু হালকা ভাবেই সবাইকে উপস্থাপন করলাম, আরে যারা ভয় দেখাচ্ছে তারা সবাইতো দুই-তিন বছর আগের কথা বলছে। এখন রাস্তা অনেক ভাল আর ট্রেকিং অনেক সহজ হয়ে গেছে। ওরা কিছুটা আশ্বস্ত হইলো…

এবার প্রস্তুতির পালা…

Khokon সকালে বাইক নিয়ে হাটাহাটি শুরু করে দিলো! 😛

Saiful হেটে অফিসে যাওয়া-আসা শুরু করলো! এতে করে হাটার প্র‍্যাক্টিস এবং সাথে টাকাও সেভ হতে থাকলো।

Auntu জোক খুব ভয় পায় তাই রিতিমত ১ প্যাকেট লবন কিনে সবার অজান্তেই ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখলো।

Azad ভাই নাকি প্রায় ২০ বছর পরে কোন গ্রুপ ট্যুরে যাচ্ছে তাও আবার ট্রেকিং এর মত ইভেন্টে!

Nadim উত্তরা (অফিস) আর নোয়াখালী (গ্রামের বাড়ী) ছাড়া আর কোন জায়গা চিনে কিনা সে ব্যাপারে যতেস্ট সন্দেহ আছে!

Asif যে কিনা ৫ মিনিটের হাটার রাস্তাও রিকশা ছাড়া কোন দিন গিয়েছে কিনা আমার জানা নাই! তবে কিছুদিন আগে প্রচুর হাটাহাটি করা লাগে বলে সাধের চাকড়িটাও ছেড়ে দিয়েছিল!

বাকি ৫ জনের জাদিপাই ঝর্ণা যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে বলে ওদের নিজেদের নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হয়নি! চিন্তা শুধু নতুনদের নিয়ে, ওরা পারবেতো? আর সবাই পারুক আর না পারুক “আসিফ” পারবেনা! সবাই ধরেই নিলাম দুই-এক জন গ্রুপ থেকে ছিটকে পরবে! 🙁

বৃহস্পতিবার রাত ১২ টায় টংগী থেকে যাত্রা শুরু করলাম। হাসির ভান্ডার “নাদিম” বলে উঠলো আমরা ঝর্ণা দেখতে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছি! সবাই দোয়া কালাম পরে ঠিকঠাক হয়ে বসো। সবাইতো রিতিমত টাস্কি খাইলো! সিরাজগঞ্জে আবার ঝর্ণা আইলো কইত্তে? পরে বুজলাম নাদিমের সব কথায় কান দিতে নাই! 😛

ভৈরব বাজারে ব্রেক, অতঃপর চা-নাস্তা সেরে সবাই গান ধরলাম। “আসিফ” যে লালনের গানের মহা কারিগর সেটা টের পেয়েই সবাই 1 More… 1 More… বলে চিৎকার করতে লাগলাম। এভাবেই চলে গেল প্রায় ১৭০ কিলমিটার পথ। পথে চা কন্যার সাথে একটু সাক্ষাৎ না করলে অন্যায় হয়ে যায় তাই কিছুটা সময় তাকে দিলাম।

যখন শ্রীমঙ্গল তখন রাত ৪:৩০, “পানশী রেস্টুরেস্ট” তখনো খোলেনি, স্টাফরা নিশ্চিত করলো আধাঘণ্টা পরেই নাস্তা রেডি হয়ে যাবে। এই ফাঁকে ফটোবাজী করার জন্য “গ্র‍্যান্ড সুলতান” এর ফ্রন্ট গেইট ছাড়া আর কোন যায়গাই উপযুক্ত মনে হচ্ছিলনা। কারন সকালের আলো ফুটতে তখনো অনেকটা সময় বাকি। হলো আনলিমিটেড ফটোবাজী! 🙂

নাস্তা রেডি, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম খিচুড়ি খাবো। দাম জিজ্ঞেস করতেই বললো, চল্লিশ টাকা প্রতি প্লেট! ওমা, খিচুরির প্লেটে চোখ জেতেই সবার চোখ ছানাবড়া! এই খিচুরি চল্লিশ টাকা কেমনে বেচে? কেউ বলে আমার এলাকায় ১২০ টাকা, কেউ বলে ১০০ টাকার কমে কোথাও পাওয়া সম্ভব না! দেড় প্লেট করে সবার উদরপূর্তি করলাম।

আমাদের পরিচিত Nabir সহ ১০ জনের আরো একটি গ্রুপ ছিল যাদের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এক সাথেই হামহাম এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

আমাদের বহনকারী গাড়ীটি চা বাগানের ভিতর দিয়ে সবুজ গালিচা মারিয়ে ছূটে চলছে। রাস্তায় অসংখ্য বাক যা রাস্তার সৌন্দর্যকে আরো বহুগুন বারিয়ে দিয়েছে। দুই পাশে শুধু সবুজ আর সবুজ যা কোন উপমায় ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। চা বাগান পেরুতেই পথে যেদিকে দুই চোখ যাচ্ছে শুধু সবুজ ধানের ক্ষেত!

আগে থেকে ঠিক করা গাইড “আতাউর” ভাই আমাদের ইশারা করে ডাকতেই টের পেলাম যে আরাম শেষ হয়ে গেল বুঝি। এবার আসল মিশন শুরু হতে যাচ্ছে… গাইডকে উঠিয়ে কিছুদূর (চাম্পারাই টি এস্টেট) যেতেই রাস্তা ভাঙা! এখানেই আমাদের থামতে হচ্ছে…

শুরু হলো ট্রেকিং এর প্রস্তুতি। যে যার যার মত পা-দুটোতে ইচ্ছেমত শান দিয়ে নিচ্ছে!

চা বাগানের ভিতর দিয়ে ছুটে চলছি…
একি! ছবির কবি Mamun এভাবে পাগলের মত দৌড়াচ্ছে কেন! সবাই অবাক তাকিয়ে রইলাম! আসলে ওর অনেক দিনের শখ পাতলা (আমার গ্রামের ভাষা, আসল নাম জানা নাই) মাথায় পরা চা শ্রমিকের ছবি তোলা, আর সেই সুযোগ সামনেই তাই এই ছুটাছুটি! আমরা যে যার যার মত চা বাগানের অপরুপ দৃশ্য ক্যামেরা বন্ধী করতে থাকলাম…

চা বাগান পারি দিতেই দেখি লাঠি হাতে একটা ছোট বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। একজন জিজ্ঞেস করলো লাঠির কাজ কি? উত্তরে ছেলেটা বলে উঠলো মাত্র ৫ টাকা! নিয়ে যান, সময় হলেই বুজতে পারবেন এর কাজ কি!

শুরু হলো হামহাম যাওয়ার মুল পর্ব! বনের ভিতর ঢুকতেই বন রক্ষীরা জোকের ব্যাপারে সতর্ক করে দিলো। এ শুনে “খোকন” পুরা অলম্পিক স্টাইলে একটা লাফ দিলো! 😛 ব্যাগ থেকে বিশাল সাইজের মোজা বের করে পরে নিলো। সারিবদ্ধভাবে হেটে চলছি…..

প্রায় ৭ টার মত সাঁকো পার হয়ে গেলাম। সাঁকো পার হতে গিয়ে সবার আগে আমি নিজেই ভয়ে নিচ (ঝিরিপথ) দিয়ে পার হলাম। সবার চোখ শুধু পায়ের দিকে জোক ধরলো বুঝি!!

এক তৃতীয়াংশ এসে ব্রেক! শুকনা খাবার, পানি এবং চকলেট খেয়ে আবার শুরু করলাম। এবার বুজা যাচ্ছে কে কতটা ক্লান্ত! রিতিমত দুই পায়ের সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করলাম সবাই, থেমে গেলে চলবেনা…..

চলছিতো চলছি…… সবার চোখে মুখে উৎকন্ঠা, আর কতদুর?

দ্বিতীয় বার ব্রেক…..

একটু জিরিয়ে সামনে এগুতেই সবাই নিচে নামছি, কিন্তু নামার শেষ কোথায় সেটা কেউ আচ করতে পারছিলামনা! নামছি, সে আর কি এক সময় না এক সময়তো শেষ হবেই। সেকি! রাস্তার মধ্যে কে যেন লুব্রিকেটিং অয়েল মেখে রেখেছে! মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পরলাম। একদুর এসে বুজি এখান থেকেই ফিরে জেতে হচ্ছে তাইলে! “আজাদ” ভাই আর “আসিফ” এর জান প্রায় যায় যায় অবস্থা! সাহস দিলাম, আর একটু কস্ট করলেই সুন্দরির দেখা মিলবে।

ছোট ভাই “আসিফ” প্রশ্ন করে বসলো! ভাই আমরা অনেক জোস না?

সেখান থেকেই এই ট্রিপের জাতীয় উক্তি হলো “আমরা অনেক জোস”

Shaheen এর মধ্যে বলার মত কোন পরিবর্তন খুজে পাইনাই। বাকি দিনগুলার মতোই স্বাভাবিক লাগছিলো যেন তার গ্রামের চিরচেনা রাস্তা দিয়েই হেটে চলছে…

খুব সাবধানে নিচে নামছি, কেউ এক চুলও ভুল করছিনা! ভুলের পরিনতি কি হতে পারে তা সবাই আচ করতে পেরেই অতিরিক্ত সাবধানতার সহিত নিচে নামতে সক্ষম হলাম! 🙂 🙂

এবার শান্তির ঝিরিপথ! সারা শরির জুরিয়ে গেল! আহ! প্রকৃতি যেন এতক্ষন ধরে আমাদেরকে বরন করার জন্যই আয়োজনে ব্যাস্ত ছিল। ঝিরিপথ ধরে হাটছি আর সবার ছোখে মুখে কি যেন জয়ের আনন্দ খুজে পাচ্ছিলাম। সবাই যেন মনে মনে বলছিল, ঝিরিপথ যেহেতু পেয়েছি ঝর্ণা আরা পালিয়ে বাচতে পারবেনা! 😛

উচু-নিচু, পাথর-গর্ত সব কিছু মারিয়ে ছুটে চলেছি আমরা ১২ জন…

একটু সামনে যেতেই কি যেন মধুর একটা সুর কানে ভেসে আসছিল। সে আর কি? ঝর্ণা সুন্দরী আমাদের গানে গানে বরন করে নেওয়ার জন্য সুরেলা কন্ঠে ডেকে চলছে….. দেখা পেলাম তার!

মনে হচ্ছিল হাজার বছর নিখোজ থাকার পর প্রিয়ার দেখা পেলাম। অঝর ধারায় ঝরেই যাচ্ছে আর মনে মনে বলছিল “আরো আগে কেন তুমি এলেনা”

আসলেই অনেক সুন্দর! আমরা অনেক জোস, হামহাম ঝর্ণাও তেমনি জোস… বাকিটা এসেই দেখার আহবান রইলো। 🙂

সবাই আপন মনে উদাস দৃস্টিতে ঝর্ণার পানে চেয়ে আছি। ঝর্ণার উপরে মানুষের কন্ঠ শুনতে পেলাম। ভাবলাম ঝর্ণার উপরে কেউ আছে নিশ্চই। গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই বললো উপরে উঠা যায় তবে অনেক রিস্কি!

চারজন উপরে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম; সবার আগে Titu তরতর করে উঠে গেল! মনে হচ্ছিল ও বাসার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু আমি পারছিনা কেন? পারার কথাও না! কোন সাপোর্ট ছাড়াই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠছি আমরা “নাদিম” পিছন থেকে জানতে চাইল সে পারবে কিনা? সাফ সাফ না করে দিলাম যে নিচে নেমে যা, তুই পারবিনা! ততক্ষনে আমি বসে পরেছি! নিচে যাব না উপরে সেটা নিয়ে মহা ভাবনায় পরে গেলাম। পা সায় দিচ্ছেনা, আসলে আমি অতি মাত্রায় ভয় পেয়েছিলাম! মনের সাহস জুগিয়ে Raju সহ ঝর্নার চুড়া সামিট করলাম। নামার সময় আরো বেশী কস্ট হলো!

এবার ফেরার পালা…

মজার ব্যাপারটা ছিল ফেরার সময় এক গ্রুপ যাচ্ছিল তাদের কাছে শুকনা রাস্তাটুকুই নাকি অনেক পিচ্ছিল মনে হচ্ছিল!
একটু হেসে সবাই বললাম সামনে এগিয়ে যান আরো মজার জিনিস পাবেন… 😛

কলাবন পাড়াতে দুপুরের খাবার তারপর মাধবপুর লেকে ঝাপাঝাপি।
এবার ঘরে ফেরার পালা… এবং নতুন কোন সুন্দরের খোজে অপেক্ষমান…

প্রকৃতিকে ভালবাসুন, প্রকৃতি কাউকে নিরাশ করেনা…. <3

#TGBBOOKFAIR

লিখেছেনঃ ফরহাদ মিয়া

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *